প্রকাশিত: ২৪/১১/২০১৫ ৮:৩১ অপরাহ্ণ
সমুদ্র থেকে অবিরাম বালি উত্তোলন : রাষ্ট্রের শতকোটি টাকা ক্ষতি

dreger
আতিকুর রহমান মানিক, কক্সবাজার:
কক্সবাজার বিমান বন্দর সম্প্রাসারণ কাজে নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাঁকখালী নদীর মোহনা- মহেশখালী চ্যানেল ও নাজিরার টেক সমুদ্র এলাকাসহ প্রতিবেশ সংকটাপন্ন বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে শক্তিশালী ড্রেজার বসিয়ে হরদম বালি উত্তোলন করে যাচ্ছে। এতে চরম ঝুঁকির মূখে পড়েছে বাকঁখালী অববাহিকা ও সমুদ্র উপকুলবর্তী বিভিন্ন এলাকা । সে সাথে নষ্ট হচ্ছে সমুদ্রের জীববৈচিত্র ও প্রাকৃতিক পরিবেশ। কক্সবাজার বিমান বন্দর সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন কাজের টেন্ডার পাওয়া কোরিয়ান প্রতিষ্ঠান ইউনিশ ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন , সিউকে ওয়াং ডেভেলপমেন্ট কোং লিঃ, হ্লা কর্পোরেশন লিঃ জেভি ও এদের সহযোগী বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান মীর আকতার হোসেন লিঃ জয়েন্টভেঞ্চারে বিমান বন্দর উন্নয়নের কাজের টেন্ডার চুড়ান্তভাবে পেয়েছেন। টেন্ডার পাওয়ার পর ওয়ার্ক অর্ডার অনুযায়ী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে উক্ত কাজ উদ্বোধন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর কক্সবাজার বিমান বন্দর সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। টেন্ডার ও ওয়ার্ক পারমিটে সিলেটি পাথর, ছোট নুড়ি পাথর ও সিলেটি বালি ব্যবহারের কথা উল্লেখ থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বেআইনি ভাবে বিভিন্ন পয়েন্টে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে দেদারসে সমুদ্রের মূল্যবান খনিজ বালি উত্তোলন করছে। সিলেটি বালির পরিবর্তে লবনাক্ত সামুদ্রিক বালি ব্যবহার করায় কক্সবাজার বিমান বন্দর সম্প্রসারণ কাজের গুণগত মাণ ও স্থায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডস্থ সমিতি পাড়া পয়েন্ট, নাজিরার টেক পয়েন্ট ও বাঁকখালী নদীর মোহনায় উপকুল থেকে অন্তত ২০০ মিটার দূরে সমুদ্রে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালি উত্তোলন করা হচ্ছে ও উত্তোলিত বালি পাইপ লাইনের মাধ্যমে স্থলভাগে নিয়ে আসা হচ্ছে। ১০ চাকার বিশালাকার ট্রাকে করে এসব বালি রাতদিন পরিবহণ করা হচ্ছে। এভাবে বালি উত্তোলনে নষ্ট হচ্ছে সামুদ্রের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ধ্বংস হচ্ছে সামুদ্রিক খনিজ সম্পদ , সামুদ্রিক প্রাকৃতিক জীব সম্পদ , মৎস্য , চিংড়ি , শামুক, ঝিনুক , ডলপিন , কাকড়া , সী-উইড, সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রানি, এনাড্রস জাতের প্রানি, ক্যাটাড্রমাস প্রজাতি , সেডেন্টারী প্রজাতি , বিভিন্ন জাতের প্রাণী, জু-প্লাংকটন এবং ফাইটোপ্লাংকটনসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের প্রজনন-আবাসস্থল। এভাবে জলবায়ু ও জীব বৈচিত্রের ইকো-সিস্টেমকে বিপর্যস্ত করে রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকার ক্ষতিসাধন করা হচ্ছে। এছাড়া সমুদ্রতল , জলরাশি , জলস্রোত, বায়ু , সামুদ্রিক প্রবাল-প্রাচীরও দূষিত হচ্ছে। অথচ জাতিসংঘের জেনেভা কনভেশন ১৯৫৮ , ১৯৬০ , ১৯৭০ সালের ১৭ ডিসেম্বর ২৭৪৯(২৫) নাম্বার সিদ্ধান্ত এবং জাতিসংঘের ১৯৮৪ সালের ৯ ডিসেম্বর জ্যামাইকা কনভেশন-এ সাধারণ পরিষদের ১৫১৪(১৫) নাম্বার সিদ্ধান্ত , জাতিসংঘের জীব বৈচিত্র কনভেনশন -১৯৯২ , ২০০০ সালের ২৯ জানুয়ারী কানাডার মন্ট্রিলে অনুষ্ঠিত জৈব নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রটোকল-২০০০ , ১৯৭৩ সালের সাইটাস , ১৯৮০ সালের আইইউসিএন বিশ্ব সংরক্ষণ কৌশল ১৯৮২ সালের প্রকৃতির বিশ্ব সনদ , ১৯৭২ সালের স্টকহোম ঘোষণা, দীর্ঘস্থায়ী জৈব রাসায়নিক পদার্থ সংক্রান্ত ষ্টকহোম কনভেনশন -২০০১ , জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক জাতিসংঘ ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন -১৯৯২, রামসার কনভেনশন -১৯৭১-এ সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে- সমুদ্রের ইকো সিস্টেম এর ক্ষতিসাধন করে কোন প্রকার ড্রেজার বসিয়ে মাটি, বালি উত্তোলন করতে পারবেনা। উক্ত জাতিসংঘের জেনেভা কনভেশন ও জ্যামাইকা কনভেনশনে বাংলাদেশ অন্যতম স্বাক্ষরকারী একটি দেশ। জাতীয় পরিবেশ নীতিমালা -১৯৯২ এর ৩(১০)ধারা অনুযায়ী দেশের উপকূলীয় ও সামুদ্রিক ইকো-সিষ্টেম এবং সম্পদের পরিবেশসম্মত সংরক্ষণ, উন্নয়ন , দুষণরোধ করার এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ সংশোধনী -২০১০ এর ৬(ঙ) ও ১৬ ধারায় মোতাবেক সমুদ্রে ড্রেজার বসিয়ে বালি উত্তোলন করা সরাসরি নিষিদ্ধ থাকলেও আইনের কোন প্রকার তোয়াক্কা না করে হরদম সমুদ্রে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালি উত্তোলন করে কক্সবাজার বিমান বন্দর সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন কাজ চালিয়ে যাচ্ছে অসাধু ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। এতে রাষ্ট্রের ক্ষতি হচ্ছে শতকোটি টাকা। এ ব্যাপারে কক্সবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সরদার শরিফুল ইসলাম জানান, উক্ত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত কি ব্যবস্থা নেয়া যায় কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মৎস্য রক্ষণ ও সংরক্ষণ আইন ১৯৫০ এর ২,৩ ধারা, মৎস্য রক্ষণ ও সংরক্ষণ বিধি ১৯৮৫, ৩(১)(২) উপবিধি (১) এবং সামুদ্রিক মৎস্য ক্ষেত্র অধ্যাদেশ -১৯৮৩ ১(খ) (ঘ) ২৪(২) ক, খ, ২৬(ক)(খ)(গ)(ঘ) ধারা অনুযায়ী নদীর মোহনা সমুদ্রের মৎস্য প্রজনন ও আবাসস্থল এলাকায় বালি উত্তোলন করতে মৎস্য সহ জীবন্ত সামুদ্রিক সম্পদের ক্ষতিসাধন করা যাবেনা। তারপরও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মীর আক্তার হোসেন লিঃ সমুদ্রে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে হরদম সামুদ্রিক বালি উত্তোলন করে যাচ্ছে। সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (সদর) ডঃ মঈন উদ্দিন আহমদ জানান, সুস্পষ্ট অভিযোগ পেলে মীর আক্তার হোসেন লিঃ কনস্ট্রাকশন ফার্মের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কক্সবাজার আনবিক শক্তি কমিশনের পরিচালক জানান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নীতিমলা অনুযায়ী খনিজ সম্পদ ও সামুদ্রিক খনিজ বালি পারমানবিক শক্তি কমিশন ছাড়া আর কেউ উত্তোলন ও ব্যবহার করতে পারবেনা। জনস্বার্থ ও দেশের কোটি কোটি টাকা ক্ষতি করে সামুদ্রিক প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিৎ বলেও মন্তব্য করেন তিনি। কক্সবাজার বিমান বন্দরের ব্যবস্থাপক সাধন কুমার মোহন্ত জানান, বিমানবন্দর সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের জন্য একটি দেশীয় ও প্রতিষ্ঠান ৩টি কোরিয়ান প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেয়া হয়েছে, তারা সমুদ্র থেকে বালি

উত্তোলনের জন্য ড্রেজার মেশিন ক্রয় করেছে শুনেছি । ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, সিলেটী বালি দিয়ে নির্মাণ কাজ করার কথা থাকলেও আমরা সস্তায় ও কম খরচে সমুদ্রে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে সহজেই বালি উত্তোলন করে নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাচ্ছি, এ পর্যন্ত কোন প্রকার প্রশাসনিক বাধা নিষেধ আসেনি। সামুদ্রিক বালি উত্তোলনে আইনগত বাধা-নিষেধের ব্যাপারে জানতে চাইলে তারা উল্টো প্রশ্ন করেন, “বাংলাদেশে কয়জন লোক আইন মেনে কনস্ট্রাকশন কাজ করে”? এ ব্যাপারে মীর আক্তার হোসেন লিঃ এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর নাসির হোসেনকে ফোন করলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে লাইন কেটে দেন।

পাঠকের মতামত

সফরে বিনোদনের পাশাপাশি জীব-বৈচিত্র্য সম্পর্কে জানার সুযোগ পেয়েছে উখিয়া কলেজ শিক্ষার্থীরা

সফরে বিনোদনের পাশাপাশি জীব-বৈচিত্র্য সম্পর্কে জানার সুযোগ পেয়েছে উখিয়া কলেজ শিক্ষার্থীরা

পলাশ বড়ুয়া:: উখিয়া কলেজের বার্ষিক শিক্ষা সফর-২০২৫ সম্পন্ন হয়েছে আজ। নানা কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে প্রায় ...